বিভিন্ন যুদ্ধে ব্রিটিশদের আর্থিক সাহায্য করতে তৈরি হয়েছিল দেশের প্রথম ব্যাঙ্ক‚ অগ্রণী ভূমিকায় বাঙালি বাবু সম্প্রদায়

Bank of Bengal

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

ভারতের প্রথম ব্যাঙ্কের নাম কী ? গুগল করলেই কয়েক হাজার পাতা বেরিয়ে আসছে । তার মধ্যে কয়েকটি আবার কুইজেরও। আবার কয়েকটি গবেষণাপত্রও। তবে সেসব পাতায় তথ্য নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বটাই প্রবল। প্রথম ব্যাঙ্কের নাম নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সে থাকুক গিয়ে। ভারতের প্রথম ব্যাঙ্ক নিঃসন্দেহে কলকাতাতেই তৈরি হয়েছিল।

প্রথাগত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা শুরুর অনেক আগেই কলকাতা পেয়ে গিয়েছিল তার ব্যাঙ্কারকে। আর এই ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠের পিছনে একটা দারুণ ইতিহাস লুকিয়ে। তখনও পলাশীর যুদ্ধ হয়নি। অনেকটাই ম্লান বাণিজ্য বন্দর সপ্তগ্রাম। ইংরেজরা ক্রমে ক্রমে জাঁকিয়ে বসছে কলকাতায়। নিজেদের প্রয়োজনে ডিহি কলকাতায় নিয়ে আসছেন
নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য। বাণিজ্যনগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে কলকাতা। সে সময় অন্য অনেক ব্যবসায়ীর মত ভাগ্যাণ্বেষণে কলকাতায় এসে হাজির হন সপ্তগ্রামের লক্ষ্মীকান্ত। লোকে তাঁকে নকু ধর নামেই চিনতেন।

নকু কিন্তু মাঝারি মাপের ব্যবসায়ী ছিলেন না। ধনকুবের বললেও কম বলা হয়। ব্যবসার প্রয়োজনে লোককে টাকা ধার দিতেন নকু। আবার আদায়েও সুদক্ষ ছিলেন। সম্ভবত সপ্তগ্রামে তাঁর ব্যবসাটি পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু সদ্য বাণিজ্যনগরী কলকাতায় আবার তিনি লাভের মুখ দেখলেন। নতুনবাজারে বসতি গড়ে বেশ ভালভাবেই দিন
কাটতে থাকল তাঁর। সেই নকু ধর একবার গঙ্গার পাড়ে বসে জপ করছেন, এ সময় হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, জলের মধ্যে এক সাহেব ভাসছেন, আধমরা। চাকর-বাকরদের দিয়ে তিনি সেই সাহেবকে উদ্ধার করলেন। শুধু তাই নয়, সাহেবকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে গেলেন নতুনবাজারে নিজের বাড়িতে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন সাহেব। আর সাহেবের সঙ্গে আলাপচারিতায় ইংরেজিটা মোটামুটি রপ্ত করে ফেললেন নকু।

ইংরেজি শেখায় নকু ধরের লাভ হল। সাহেব মহলে তাঁর যোগাযোগ বাড়ল। আর সাহেবরা নতুন এই শহরে ধনকুবেরকে পেয়ে গেলেন। শোনা যায়, টাকা লাগলেই নাকি এই সাহেবরা যোগাযোগ করতেন নকুর সঙ্গে। ইংরেজদের ব্যাঙ্কার হয়ে গেলেন নকু । যোগাযোগ মানে যে সে যোগাযোগ নয়, একেবারে রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে বন্ধুত্বটা হয়েই গেল নকু ধরের । টাকার আদান প্রদান তো আস্থা জুগিয়েই ছিল, শোনা যায় আরও একটি ঘটনা নকু আর ক্লাইভের মধ্যে সম্পর্কটাকে মজবুত করে দিয়েছিল। নকু ধরের মাধ্যমেই ইংরেজরা পেয়েছিল এক বিশ্বাসী লোক—লক্ষ্মীকান্ত ওরফে নকুর অধীনে কাজ করতেন নবকৃষ্ণ দেব।

ইংরেজদের সঙ্গে নবকৃষ্ণের প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেন নকু ধরই। নবকৃষ্ণ হয়ে গেলেন কোম্পানির কেরানি ওয়ারেন হেস্টিংসের পারসি শিক্ষক। কাশিমবাজারে যখন হেস্টিংস বদলি হন, তখন তাঁর সঙ্গী হন নবকৃষ্ণ। কিন্তু বিপদ বুঝে হেস্টিংসকে সতর্ক করে কলকাতায় ফিরে আসেন নবকৃষ্ণ। এরপরই হেস্টিংস বন্দি হন এবং ইংরেজদের ওপর আক্রমণ করার জন্য ঘুঁটি সাজিয়ে ফেলেন সিরাজের সৈন্য। সে সময় রাজা রাজবল্লভ একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ইংরেজদের কাছে। অনুরোধ করেন, কোনও বিশ্বস্ত হিন্দুকে দিয়েই যে সে চিঠি পড়ানো হয় এবং উত্তর লেখা হয়।

তখন ডাক পড়ে নবকৃষ্ণের। ইংরেজদের অন্যতম বিশ্বস্ত মানুষটিই হন তিনিই। পলাশীর যুদ্ধের পর সম্পর্কটা আরও সুদৃঢ় হয় নকু ধর এবং ইংরেজদের। লাগে টাকা তো দেবে গৌরী সেনের মত ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজন পড়লেই নকু ধর ওরফে লক্ষ্মীকান্তের দ্বারস্থ হতে থাকেন রবার্ট ক্লাইভ থেকে শুরু করে সে যুগের তাবড় কোম্পানির আধিকারিকরা। শোনা যায়, ইংরেজ মারাঠা যুদ্ধের সময় ইংরেজদের নকু ন’লক্ষ টারকা ঋণ দিয়েছিলেন। ‘ব্যাঙ্কার’ নকু ধরের ওপর বেশ খুশি ছিলেন ইংরেজরা। ১৮৬২ সালে তাঁরা তাঁকে খেলাত্ দিতে চান। কিন্তু নকু সেই উপাধি তাঁর দৌহিত্রকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। নকুর নাতি হন মহারাজা সুখময় রায়। ইংরেজরা বুঝতে পারল, এ দেশে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে একটা ব্যাঙ্ক অত্যন্ত প্রয়োজন। আর সে কারণেই আলেকজান্ডার অ্যান্ড কোম্পানির উদ্যোগে তৈরি হল ‘হিন্দুস্তান ব্যাঙ্ক’ বা ‘ব্যাঙ্ক অফ হিন্দুস্তান’। সালটা ১৭৭০। কিন্তু অল্প কিছুদিন পর বন্ধ করে দিতে হল এই ব্যাঙ্ক। এরপর ১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস তৈরি করলেন গভর্নমেন্ট সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক। সেটিও বন্ধ হয়ে গেল। ১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয় ‘ব্যাঙ্ক অফ ক্যালকাটা’, তিন বছর পর এই ব্যাঙ্কই হয় ‘বেঙ্গল ব্যাঙ্ক’।

বেঙ্গল ব্যাঙ্কের প্রথম এবং একমাত্র ডিরেক্টর নিযুক্ত হন সুখময় রায় । ভাবুন একবার, ইংরেজদের সেই
তথাকথিত ব্যাঙ্কারের নাতি হলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যাঙ্কের ব্যাঙ্কার । সে যাই হোক, অনেকের মনেই প্রশ্ন আসছে, ব্যাঙ্কের লেনদেন কীভাবে হতো ? বেঙ্গল ব্যাঙ্কই প্রথম নোট নিয়ে আসে বাজারে । এক-দু টাকার নোট ভেবে ভুল করবেন না । তখনকার বাজারে চালু ছিল ৫০০, ১০০, ৫০ টাকা এবং এক মোহরের নোট । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সে সময়ও বাজারে নোট জাল হতো । আর তখনকার দিনেও জালিয়াতরা তো ছিলই। এ প্রসঙ্গে কাজল মিত্র একটা দারুণ ঘটনার উল্লেখ করেছেন—‘১৮২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেঙ্গল ব্যাঙ্কে একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছিল। রাজকিশোর দত্ত নামে একজন লোক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাগজ বন্ধক রেখে কিছু টাকা ধার চায়। কোম্পানির কাগজ দেখে সেক্রেটারি জে. এ. ডারিন জানান কাগজগুলি জাল। কিন্তু অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল কাগজগুলি ঠিক আছে বলে মত প্রকাশ করেন। রাজকিশোর দত্তকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা দেওয়া হয়। পরে জানা যায় কাগজগুলি সত্যিই জাল ছিল।’

তবে বাঙালি ব্যাঙ্কারের কথা বলতে গেলে আরও একজনের কথা না বললেই নয় । তিনি হলেন রবি ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর । ম্যাকিনটোশ কোম্পানির অংশীদার ছিলেন দ্বারকানাথ। এই সংস্থা কমার্সিয়াল ব্যাঙ্ক নামে একটি ব্যাঙ্ক তৈরি করে ১৮১৯ সালে। ১৮২৪ সালে তৈরি হয় ক্যালকাটা ব্যাঙ্ক। এই দুই ব্যাঙ্ক মিশে
গিয়ে হয় ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক। ব্যবসা এবং চাষবাসের জন্য ঋণ দেওয়াই ছিল এই ব্যাঙ্কের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু ম্যাকিনটোশ কোম্পানি ফেল করে ১৮৩৩ সালে। ফলে ব্যাঙ্কটিও ফেল করে। কিন্তু আমানতকারীদের টাকা নিয়ে পালাননি দ্বারকানাথ। সে বছর ৫ জানুয়ারি ‘সমাচার দর্পণ’-এ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা হয়—‘শ্রীযুক্ত দ্বারকানাথ ঠাকুর ঐ ব্যাঙ্কের যত দাওয়া আছে তা পরিশোধ করবেন।’ ১৮৩৬-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পার্লামেন্টের আইন অনুযায়ী ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব পাস করে। বেঙ্গল ব্যাঙ্ক কিন্তু তখনও চলছে। লেখার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে একটি কথা না উল্লেখ করলেই নয়। সেদিনের সেই বেঙ্গল ব্যাঙ্ক
বা ব্যাঙ্ক অফ ক্যালকাটা আজকেও চলে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া নামে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *