জলে জঙ্গলে সম্বলপুর

sambalpur travel

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

একটুও গুরুত্ব দিই নি। বেশ কিছুদিনের নিয়মমাফিক জীবনযাপন থেকে সামান্য একটু অবসর, ব্যস, এর বেশি কিছু ভাবিইনি। তাছাড়া, আমাদের বন্ধুরা একসাথে যেখানেই যাব, সেই জায়গাটাই নিমেষে অসাধারণ হয়ে উঠবে – এ আত্মবিশ্বাস আমার আছে, তাই গন্তব্য নিয়ে একটুও চিন্তা না করে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলাম।

জঙ্গল, বিশেষভাবে পাহাড়ি জঙ্গল আমার প্রেম। সঙ্গে যদি নদী থাকে তাহলে তো আমি ব্যভিচারী হতেও রাজি। জীবনে অনেক জঙ্গলে গিয়েছি, ভবিষ্যতে আরও যাব কিন্তু অমিত যখন বলল এখানেও নদী আছে, জঙ্গল আছে … তখন আমার খুব হাসি পেয়েছিল। আরে বাবা, সারান্ডা, কাজিরাঙা বা জলদাপাড়ার মতো জঙ্গলের প্রতিটা বাঁক গুনে গুনে ঘোরা মানুষকে বলছিস, ‘এখানেও নদী, জঙ্গল আছে’ ? খুব স্পষ্ট করে ওকে বললুম, ‘দেখ অনেকদিন বেরোইনি, বেরোচ্ছি, তুই আমাকে আর নদী জঙ্গল বোঝাস না’। ও আর কথা না বাড়িয়ে ওর না বলা বাড়তি কথাগুলোকে জমিয়ে রেখে ঢোক গিলে নিল।


মহানদীর তৈরি করা হ্রদ 

রাতের ট্রেন, সম্বলপুর এক্সপ্রেস। ট্রেন ছাড়ার পরও আমার বেড়ানোর অহংকার অটুট ছিল। নতুন জায়গার বদলে পুরনো ঘোরা জায়গা নিয়েই আলোচনা করছিলাম, যেন এই জায়গাটা সপ্তাহান্তের দীঘা বা মন্দারমনির থেকে সামান্য একটু এগিয়ে। দূরপাল্লার ট্রেনের স্বভাবিক নিয়ম মেনে ঘন্টা দুয়েক লেটে ট্রেন উড়িষ্যার সম্বলপুরে পৌঁছল। অমিত আর রাজু আগে থেকেই হোটেল বুক করে রেখেছিল। ব্যাগপত্র নিয়ে আমরা যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে দশটা। একটা ঘিঞ্জি শহরের মধ্যে হোটেল। এখানে যে কোনও ভাল বেড়ানোর জায়গা থাকতে পারে, সেটা ভাবতেও বেশ সাহস লাগে। আমরা ঠিক করলাম এক ঘন্টার মধ্যে বেরোব, সেই মতো সবাই তৈরি হতে লাগল, মানে, পাঁচটা বাচ্চা, চারটে বউ, তিনটে বর এবং পুলু – ধুলো এবং জল নিয়ে চিন্তায় যার সারাদিনের অনেকটা সময় কেটে যায়। নিজেকে জীবানুহীন রাখার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাথরুমে অন্যদের থেকে একটু বেশিই সময় লাগে ওর। আমি আর অমিত গেলাম গাড়ি ঠিক করতে। এখান থেকে গাড়ি পাওয়াটা খুব কঠিন নয়। একটু দরদস্তুর করে নিতে পারলে সব ধরণের গাড়িই পাওয়া যায়।

আমরা দুটো জীপ সারা দিনের জন্য বুক করে ফেললাম। এই জীপগাড়ি চিরকালই আমার খুব প্রিয়। কিন্তু এই জীপগাড়িই পুলুর উদ্বেগ একটু বাড়িয়ে দিল, কারণ জীপে কাঁচ নেই, ধুলো আটকায় না। ওকে বোঝালাম, কোল্ড স্টোরেজ আর মর্গ ছাড়া কোথাও বোধহয় ধুলোর পথকে আটকানো যায় না। কী বুঝল জানি না, ‘এরকম খোলা গাড়ি, কোন মানে হয় না, বাচ্চারা রয়েছে…’ নিজের মনে গজগজ করতে করতে, একটু বিরক্ত হয়েই জীপের পিছনে একটা আপাত ধুলোহীন জায়গা বেছে নিল।

এখান থেকে বেরিয়ে পনেরো-কুড়ি কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে বেশ কিছু জায়গা দেখে নিলাম। যার মধ্যে সম্বলেশ্বরী মন্দির, ঘন্টেশ্বরী মন্দির, হুমার হেলানো মন্দির উল্লেখযোগ্য। পুরীর মাসির বাড়ি, পিসির বাড়ির মতো ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটা জায়গাতেই এরকম কিছু মন্দির থাকে যেগুলো ওখানকার গাড়িওলাদের বাঁচিয়ে রাখে। চার,পাঁচটা জায়গা নিয়ে ফাইভ পয়েন্ট বা সেভেন পয়েন্ট নাম দিয়ে একটা প্যাকেজ তৈরি করতে পারলেই কেল্লা ফতে, প্যাকেজ রেটটা বাড়ে। কাস্টমারও খুশি হয় কারণ বেড়িয়ে ফিরে তারা অনেক বেশি ঘোরা জায়গার নাম বলতে পারে, তবে এখানকার এই মন্দিরগুলো মাসির বাড়ি বা পিসির বাড়ির মতো অত সহজ সরল নয়। এদের প্রত্যেকেরই একটা ইতিহাস আছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা সৌন্দর্য আছে। উড়িষ্যার রাজাদের মহান কীর্তি এইসব মন্দিরগুলো যেন তাদের অসাধারণ ভাস্কর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে আমাদেরই জন্য। পূণ্যলোভাতুর পূন্যার্থীদের ভীড় অপেক্ষাকৃত কম এবং শহর থেকে দূরে নির্জন স্থানে অবস্থিত হওয়ায়, মন্দিরগুলো সময় নিয়ে দেখতে কোন অসুবিধা হয় না।


হুমা মন্দির 

তবে অন্য অসুবিধা হল, আর সেটার জন্য আমিই দায়ী। এই দায়িত্বহীনতার জন্য আমরা সবাই বেশ মুশকিলেই পড়লাম। রাস্তার ধারে একটা দোকান থেকে এক পেটি জলের বোতল কিনেছিলাম আমি, যার পেটিতে ঘূন ধরেছিল (জলে নয়) । আমাকে প্রচন্ড মুখ করে পুলু পেটিটা ফিরত দিতে গেল, এবং একটা গোলমাল শুরু হল। দোকানদার বুঝতে পারছিলেন না, যে পেটিতে ঘূন ধরলে বোতলের জলের সমস্যা কোথায় ? রাজু পুলুকে বোঝানোর জন্য বলল, ‘পৃথিবীর সব জলই তো পুরনো’, কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। আমরা জানি, জল আর ধুলোর জন্য ও জীবনও দিতে পারে। আমাকে প্রচন্ড বকাঝকা করে, দোকানদারের সঙ্গে তর্কে জয়ী হয়ে অপেক্ষাকৃত কারেন্ট ডেটের জলের পেটি নিয়ে পুলু গাড়িতে উঠল এবং আমরা চললাম হীরাকুদ বাঁধ।

এই জায়গা থেকেই আমার অহংকার ভাঙতে শুরু করল। দু’চোখ ভরে দেখতে লাগলাম মানুষের তৈরি করা অসাধারণ সুন্দরী হীরাকুদকে। মহানদীকে আটকে রেখে এশিয়ার দীর্ঘতম এই বাঁধ উড়িষ্যা তথা পৃথিবীর গর্ব। চারদিকের যেদিকেই তাকাই চোখ ফেরানো বেশ কঠিন। কোথা দিয়ে ঘন্টা তিনেক সময় চলে গেল বুঝতেই পারলাম না। ওখানেই সুর্যাস্ত দেখতে দেখতে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনে পড়ল, আজ সারাদিন ভাত খাওয়াই হয়নি। প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যের কাছে ক্ষিদেও হার মেনেছে। শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, বাচ্চাগুলোও টুকটাক খাবার খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে একটা পুরো দিন, খাবার চাইবার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই হয়নি ওদের।


হীরাকুঁদ বাঁধ

রাতে হোটেলে ফিরে আমাদের উৎসাহ বেশ বেড়ে গেল। ট্রেনে ওঠার আগের দিনে ঢোক গিলে নেওয়া কথাগুলো এবার উগরে দিল অমিত, বলল জায়গা না দেখে কোন জায়গাকে আন্ডার এস্টিমেট করিস না। মাথা নীচু করে ওর কথা মেনে নিলাম, বললাম, কাল খুব সকালে বেরিয়ে পড়ব। দেবড়িগড়ের রাস্তাটা নাকি খুব সুন্দর। সবাই সোচ্চারে আমাকে সমর্থন করলেও পুলু একটু ভাবছিল, মানে ও তখন সকালের প্রকৃত সংজ্ঞা খুঁজছে, যতই হোক ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের সকাল তো ! বড্ড অলস।


দেবড়িগড় যাওয়ার রাস্তা

পরের দিন সকালে আমাদের গাড়ি স্টার্ট নিল দেবড়িগড়ের উদ্দেশ্যে। এর ঘন্টাখানেক পরই এল সেই সময় যার জন্য আমরা কেউই বোধহয় প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের গাড়ি ছুটতে শুরু করল হীরাকুদ বাঁধের তৈরি রাস্তা ধরে। একদিকে মহানদীর অনন্ত নীল জলরাশি আর অন্যদিকে বিস্তৃত ধুসর প্রান্তরের মাঝখানে হলুদ রঙের বাঁধ দেওয়া এই সিলেট রঙা রাস্তাটা যেন যত্নে ফোটানো জিনিয়া। এই রাস্তাটা দিয়ে যাওয়াই একটা বেড়ানো, যার জন্য অন্তত একটা গোটা দিন প্রয়োজন। ও হ্যাঁ, এখানে কিন্তু একটুও ধুলো নেই। স্বাভাবিক ভাবেই পুলুকে ধরে রাখা গেল না। গাড়ি থামিয়ে মহানন্দে বিভিন্ন পোজে ছবি তুলতে লাগল।

দুপুর একটা নাগাদ আমরা দেবড়িগড় ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির গেটে পৌঁছলাম। পিছনে ফেলে আসা পথটা তখনও আমাদের টানছিল। মনে হচ্ছিল ওই পথের ওপরই সারাক্ষন ঘুরতে থাকি।


দেবড়িগড়, জঙ্গলের পথে 

আবার নতুন সমস্যা, আবার সেই আমারই ভুল সিদ্ধান্ত এবং পুলু। জঙ্গলের গেটে আমাদের আটকে দিল। ভিতরে ইকো ট্যুরিজিম’এর কটেজে বুকিং থাকলেও বাঁধা হয়ে দাঁড়াল আমাদের গাড়ি, মানে আমার আর অমিতের পছন্দের জীপ। ঘেরা গাড়ি ছাড়া এরা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকতে দেয় না, সম্পুর্ণ প্রশাসনিক নিয়ম যেটা পুলুর ভাবনার সঙ্গে মিলে গেল। গর্জে উঠে গজগজ করতে শুরু করল পুলু …‘সব কিছু আবেগ দিয়ে হয় না, একটু ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এখন বোঝ…তখনই বলেছিলাম, শুনলি না’। ওকে বললাম, তুই তো ধুলোর জন্য বলেছিলি, আর এরা বাঘ, ভাল্লুকের জন্য বলছে, দুটো কি এক হল ?… পুলুর মাথায় আমার কথা ঢুকল না। কিন্তু আমরা তো তখন রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছি, বুঝতে পেরে গেছি যেখানে যাওয়ার রাস্তা এত সুন্দর সেখানটা কত সুন্দর হতে পারে। পুলুর গাঁইগুঁই সত্ত্বেও আমরা ফরেস্ট অফিসারকে রিকোয়েস্ট করে ওই গাড়ি নিয়েই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি যোগাড় করলাম এবং গন্তব্যে পৌঁছলাম।


দেবড়িগড় জঙ্গলে

এবার কিন্তু আমার সব অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম বিস্তৃত নীল জলরাশির মধ্যে থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর আঁকা বাঁকা ছোট ছোট পথের দিকে। এ যেন বহু দিন ধরে কোন শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা এক অসামান্য ছবি, যেখানে রঙ, কম্পোজিশন বা কল্পনার মিশ্রণ যথাযথ। নিজেকে খুব ছোট মনে হল। এমন এক জায়গায় না এসে নিজেকে পর্যটনপ্রেমী হিসেবে দাবি করা আর ইলিশ মাছ না খেয়ে নিজেকে মৎস্যপ্রেমী বলা, একই ব্যাপার।


মহানদী, সূর্যাস্ত 

ওইদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত জঙ্গলে ঘুরলাম। রাতে ওখানকার রাঁধুনিদের হাতে তৈরি ডিমের ঝোল ভাত খেয়ে বারান্দায় বসে মহানদী আর সবুজ পাহাড়ের সঙ্গমের শব্দ শুনতে শুনতে দেখলাম একটা বাচ্চাও ঘুমোয়নি, ওরাও হতবাক… সৌন্দর্য এত সুন্দর হতে পারে !


মহানদী‚ অন্য রূপে

পরের দিন ভোরে সুর্যোদয় দেখে নদীতেই স্নান করলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে বউ, বাচ্চা আর পুলুকে নিয়ে ঘন্টা দুয়েকের বোটিং এবং জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথে হাঁটা। চারদিকে শুধুই সুন্দর। যা কিনা এই আপাত প্রচারহীন জায়গাটার একমাত্র বৈশিষ্ট্য।

অবশেষে ফেরার পালা। এই সুন্দরকে ছেড়ে আবার কংক্রিটের জঙ্গলে। ওখান থেকে গাড়িতে সোজা সম্বলপুর ষ্টেশন। রাতের খাবার কিনে ট্রেনে উঠে রওনা দিলাম রেশন, বাজার, গ্যাস আর ওষুধের সংসারে। আবার সেই কেনা জল আর ধুলোর রাজত্বে – পুলুরা যেখানে কষ্ট করে বেঁচে থাকে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published.