সৃষ্টি-সংহার-রক্ষা করতে দশরূপে আবির্ভূত হন উলঙ্গিনী ছিন্নমস্তা দেবী কালী

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী বা ‘বোধন নবমী’ তিথি থেকে ‘নব্যমাদিকল্প’-এর দুর্গাপুজোর বোধন দিয়ে হয় বাংলার উৎসব মরসুমের সূচনা । চলে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের নবমী অর্থাৎ, জগদ্ধাত্রী পুজো পর্যন্ত। এই তিন পক্ষ কাল বা দেড় মাস যাবত আয়োজিত সমস্ত পুজোই শক্তির আরাধনা। এর মধ্যে দুর্গাপুজো এবং কালীপুজোই প্রধান। দুর্গাপুজো সারা ভারতজুড়ে হলেও কালীপুজো প্রধানত বঙ্গদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তা খুব প্রাচীনও নয়। কিন্তু বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থে দেবী কালিকার উল্লেখ পাওয়া যায় শক্তির অংশ হিসেবে।

মুণ্ডক উপনিষদে শক্তিকে সাতটি অগ্নি শিখা বা অগ্নিজিহ্বা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সপ্ত অগ্নিজিহ্বার প্রধান হলেন কালী। অন্য ভাবে বলা হয়ে থাকে, যিনি কালকে ধারণ করেন তিনিই কালী । আবার মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে, মহাকাল সর্বজীবকে গ্রাস করেন। সেই মহাকালকেই যিনি নিজ অঙ্গে ধারণ করেন, তিনিই কালী। ‘কালী’ শব্দটি এসেছে ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ থেকে। যার অর্থ— কৃষ্ণ (ঘোর কালো) বর্ণ। মহাভারত-এ কালীকে দুর্গার একটি রূপ হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে। আবার ওই মহাভারতেই কালরাত্রি বা কালী নামে এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, বর্ণনা মতে, যিনি মৃত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন। হিন্দু শাক্ত বিশ্বাস অনুসারে, শাক্ত দেবী কালী বা কালিকা দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা। বিশ্বসৃষ্টির আদি কারণ তিনি। আবার অন্য মতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহামায়া । ভারতীয় পুরাণ ও তন্ত্রগুলিতে কালীর বিভিন্ন রূপভেদ দেখা যায়। তবে সাধারণভাবে তিনি নগ্না, চতুর্ভুজা, কৃষ্ণবর্ণা, লোলজিহ্বা, মুক্তকেশী, নরমুণ্ডমালাবিভূষিতা ও নরমুণ্ডধারী, বরাভয়দাত্রী এবং শিবের বুকের উপর দণ্ডায়মানা ।

ভারতীয় হিন্দু ধর্মে আবার পাঁচটি উপ বিভাগ রয়েছে। এগুলি হল শৈব বা শিবের উপাসক, বৈষ্ণব বা বিষ্ণুর উপাসক, শাক্ত বা শক্তির উপাসক, গাণপত বা গণেশের উপাসক এবং সৌরী বা সূর্যের উপাসক। এগুলির মধ্যে সৌরী ও গাণপত-রা সংখ্যায় খুবই কম। হিন্দু ধর্মের অধিকাংশই মূলত ওই বাকি তিন উপধর্মের উপাসকদের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। আর্যদের নিয়ে আসা ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য, এটি ছিল ব্রাহ্মণ গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এক ধর্মীয় অনুশাসন যা সাধারণ ভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম নামে পরিচিত । আর্যদের আগমনের পূর্বেও এ দেশে ধর্মাচারণ ছিল, তবে তা খুব সংগঠিত পদ্ধতিতে নয় । আর্যরা এখানে আসার পর ওই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম কালক্রমে আচারসর্বস্ব হয়ে উঠলে তাদের মধ্যে থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরম্ভ হল। অবশ্য ততদিনে আর্য জাতিগোষ্ঠী অনেকাংশেই ভারতীয়ত্ব অর্জন করে ফেলেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন অধিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে তাদের সংস্কৃতির থেকেও নানা উপাদান তারা নিজেদের সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করে নেয়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, শাক্ত অর্থাৎ, দুর্গা, কালী প্রভৃতি দেবতার উপাসনার ধারনা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন অধিবাসীদের থেকেই পাওয়া । আবার বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যেও বিভিন্ন রকম শক্তির উপাসনার কথা রয়েছে বলে জানা যায়।

শাক্তধর্ম বিকাশের ইতিহাসে ‘মহাবিদ্যা’ ধারণার বিকাশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ মনে করেন, এই ধারণা শাক্তধর্মে ভক্তিবাদের সূচনা ঘটিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ওই ভক্তিবাদ চূড়ান্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ হিন্দু দেবমণ্ডলীতে পুরুষদেবতার প্রাধান্যের প্রতিক্রিয়ারূপে বা পাশাপাশি এক নতুন ধর্মান্দোলনের সূচনা ঘটেছিল, যেখানে পরম সত্ত্বাকে নারীরূপে কল্পনা করা হল । এই মতকে ভিত্তি করে একাধিক ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়েছিল সেই সময়ে । গ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘দেবীভাগবত পুরাণ’। দেবীভাগবত-এর সপ্তম স্কন্দের শেষ নয়টি অধ্যায় দেবী গীতা নামে পরিচিত । এটি শাক্তধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত হয় কোথাও কোথাও ।

কালীর দশটি বিভিন্ন রূপ ‘দশমহাবিদ্যা’ নামে পরিচিত । এর পশ্চাতে রয়েছে এক পুরাণ-কাহিনি । সেই কাহিনি অনুসারে, শিব ও তাঁর স্ত্রী তথা পার্বতীর পূর্বাবতার দাক্ষায়ণী (অর্থাত দক্ষ-কন্যা) সতীর মধ্যে একটি দাম্পত্য-কলহ থেকে দশমহাবিদ্যার সৃষ্টি । ওই কাহিনি অনুসারে বলা হয়, সতীর পিতা দক্ষ শিব ও সতীর বিবাহে মত দেননি । তাই তিনি শিবকে অবজ্ঞা করবার জন্য একটি বড় যজ্ঞের আয়োজন করলেন এবং সেখানে নববিবাহিত শিব-সতীকে আমন্ত্রণ জানালেন না ।

ইতিমধ্যে নারদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সতী বিনা আমন্ত্রণেই পিতৃগৃহে যেতে চাইলেন কিন্তু শিব তাঁকে বারণ করলেন সেখানে যেতে । ক্রুদ্ধ সতী স্বামীর অনুমতি আদায়ের জন্য তৃতীয় নয়ন থেকে আগুন বের করতে করতে কালী বা শ্যামায় রূপান্তরিত হলেন। সতীর ওই ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে শিব পালাতে গেলে সতী দশ ‘মহাবিদ্যা’-র রূপ ধারণ করে শিবকে দশ দিক দিয়ে ঘিরে ফেলেন। এর পর শিব তাঁকে দক্ষযজ্ঞে উপস্থিত থাকার অনুমতি দিলেন । সতীর ওই দশ প্রকার বিভিন্ন রূপ বা ‘মহাবিদ্যা’ পরিচিত ‘দশমহাবিদ্যা’ নামে ।

মহাবিদ্যা বা দশমহাবিদ্যা হিন্দুধর্মে দেবী অর্থাৎ দিব্য জননীর দশটি বিশেষ রূপের সমষ্টিগত নাম । দেবিত্বের এই সারণিতে একদিকে যেমন রয়েছে ভয়ংকর দেবীমূর্তি, অন্য প্রান্তে রয়েছে অপরূপ সুন্দর দেবীপ্রতিমাও ।

মুণ্ডমালা তন্ত্র অনুসারে দশমহাবিদ্যা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলাকামিনী । শাক্তরা বিশ্বাস করেন, একই সত্য দশটি ভিন্ন রূপে প্রকাশিত । দিব্য জননী দশটি বিশ্বরূপে দৃষ্ট ও পূজিত হয়ে থাকেন । এই দশটি রূপই হল দশমহাবিদ্যা । মহাবিদ্যাগণ প্রকৃতিগতভাবে তান্ত্রিক । তাঁদের সাধারণ নামগুলি হল:

কালী: সর্বসংহারকারিণী, কাল ও মৃত্যুর দেবী । কালীকুল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবী ।

তারা: পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকারিণী (তারিণী) দেবী । বিশ্বের উৎস হিরণ্যগর্ভের শক্তি এবং মহাশূন্যের প্রতীক ।

ষোড়শী : (ত্রিপুরসুন্দরী বা ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী) : পূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার স্বরূপ । শ্রীকুল সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ দেবী । তান্ত্রিক পার্বতী নামে পরিচিতা ।

ভুবনেশ্বরী: বিশ্বজননী । পার্থিব জগতের শক্তিসমূহের প্রতীক ।

ভৈরবী: ভয়ংকরী দেবী। সেই কামনা ও প্রলোভনের স্বরূপ, যা মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যায়।

ছিন্নমস্তা : উলঙ্গিনী দেবীমূর্তি । তিনি স্বহস্তে নিজ মস্তক ছিন্ন করে নিজ রক্ত নিজেই পান করেন । চক্রপথে আত্মধ্বংস ও আত্মপুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে সৃষ্ট জগতের অবিরাম বিদ্যমানতার শক্তির প্রতীক ।

ধূমাবতী : বিধবা দেবীমূর্তি । অগ্নির দ্বারা জগৎ ধ্বংসের পর ভষ্মরাশির মধ্য থেকে যে ধূম নির্গত হয়, তার স্বরূপ । তাই তাঁর নাম ধূমাবতী । তিনি কখনও কখনও অলক্ষ্মী বা জ্যেষ্ঠাদেবী নামেও অভিহিতা হন ।

বগলামুখী : শত্রুনিষ্ক্রিয়কারিণী দেবী । ঈর্ষা, ঘৃণা ও নিষ্ঠুরতার মতো মানবচরিত্রের অন্ধকার দিক নিয়ন্ত্রণ করেন । তাঁকে সারস-মুণ্ড রূপেও কল্পনা করা হয়।

মাতঙ্গী : কর্তৃত্ব শক্তির দেবী । জাতিহীন দেবী, তান্ত্রিক সরস্বতী ।

কমলাকামিনী: বরাভয় প্রদায়িনী শুদ্ধ চৈতন্যের দেবী । ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর অন্যরূপ । তান্ত্রিক লক্ষ্মী নামেও অভিহিতা ।

মহাবিদ্যা প্রধানত এই দশটি রূপই পরিচিত কিন্তু মহাবিদ্যার সংখ্যা নিয়ে মতান্তরও রয়েছে । একটি মতে আবার মহাবিদ্যার সংখ্যা ২৭ বলা হয়েছে । দুর্গা, কামাখ্যা ও অন্নপূর্ণাও মহাবিদ্যা অন্তর্গত বলে কোথাও বলা হয়েছে । মালিনী বিজয় গ্রন্থের মতে, মহাবিদ্যারা হল— কালী, নীলা, মহাদুর্গা, ত্বরিতা, ছিন্নমস্তিকা, বাগ্বাদিনী, অন্নপূর্ণা, প্রত্যঙ্গিরা, কামাখ্যাবাসিনী, বালা, মাতঙ্গী ও শৈলবাসিনী ।

(পুনর্মুদ্রিত)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published.