নীলকান্তমণি থেকে অন্তর্জলির যাত্রা হয়ে কালীঘাট মন্দির অবধি বিস্তৃত ছিল বাবুদের রেষারেষি

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

পলাশীর যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল অনেকেরই ভাগ্য । ইংরেজদের কাছাকাছি এসে অনেক সাধারণ গৃহস্থই হয়েছিলেন সমাজের বিত্তশালী মানুষদের অন্যতম। তবে সবটাই যে হাতের মুঠোর মধ্যে চলে আসা এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। এই মানুষগুলির প্রখর বুদ্ধি এবং শিক্ষার জোরে তাঁরা ইংরেজদের মন জয় করতে পেরেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাকি রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ইংরেজি-আরবি-ফার্সি-উর্দুতে ছিলেন চৌখশ। সামান্য কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের আগে থেকেই তাঁর বরাত খুলতে শুরু করে। তারপর তো তিনি রাজা। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। বিলাসিতার চরম পর্যায়।

তবে কলকাতার আদি বিত্তশালীদের অনেকেই কিন্তু যুদ্ধে বরাত ফেরা বড়লোকদের পছন্দ করতেন না। একটা অবজ্ঞার ভাবও কোথাও লুকিয়ে ছিল। আর সেই অপছন্দের জায়গা থেকেই চলত একটা রেষারেষি। একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা আদি বনাম নয়া বিত্তশালীদের মধ্যে। যেমন শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দত্তের সঙ্গে হাটখোলার চূড়ামণি দত্তের পরিবারের মধ্যে একটা প্রছন্ন প্রতিযোগিতা। হাটখোলার দত্তরা ছিলেন অত্যন্ত ধনী। রুপোর বাসনে তাঁরা
নাকি খাওয়া দাওয়া করতেন। কাপড়ের পাড়ে অস্বাচ্ছন্দ্য ছিল বলে পার ছিঁড়ে তাঁরা কাপড় পড়তেন। সেই পরিবার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ‘যুদ্ধে ভাগ্য ফেরা’ নবকৃষ্ণের পরিবারের সঙ্গে। আর সেই প্রতিযোগিতা যে কতদূর পৌঁছেছিল, ইতিহাস হয়ত তার সাক্ষী। সাক্ষী সে কালের কলকাতাও। প্রতিযোগিতা যে কতদূর পৌঁছেছিল, তার একটা উল্লেখ করা যাক—

একবার নবকৃষ্ণ নিমন্ত্রণ তাঁর পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করে এলেন দত্তদের। সাজানো হল শোভাবাজারের রাজবাড়ি। লাল শামিয়ানা খাটানো হল, ঝাড় লন্ঠন দিয়ে মুড়ে ফেলা হল প্রাসাদ। কিন্তু দত্তদের মেয়ে বাড়িতে ঢুকতেই বদলে গেল সব কিছু। লাল রঙের শামিয়ানা বদলে হল ময়ূরপঙ্খী। ঝাড় লন্ঠনের আলো থেকে বেরোতে
থাকল এক অদ্ভুত জ্যোতি। সক্কলে তো হতবাক। নবকৃষ্ণও তাজ্জব। জানা গেল, চূড়ামণি দত্তের মেয়ের আংটির কারণেই এই কাণ্ড। আংটিতে লাগানো নীলকান্তমণি। আর সেই নীলকান্তমণি থেকেই ছটা বেরোচ্ছে। কৌতূহল নিয়ে নবকৃষ্ণ হাতে নিয়ে দেখলেন আংটিটি। মেয়ে ফিরে গিয়ে চূড়ামণিকে সব কথা বললেন। নবকৃষ্ণকে অপমানের আরও একটি সুযোগ পেয়ে গেলেন চূড়ামণি। পরদিন তিনি আরও পাঁচটি জিনিসের সঙ্গে শোভাবাজার রাজের কাছে আংটিটি উপঢৌকন হিসেবে পাঠালেন। অপমানিত করলেন রাজাকে।

একবার শোভাবাজার রাজবাড়িতে এক গরিব ব্রাহ্মণ তাঁর ছেলের কানের ব্যথার জন্য সাহায্যপ্রার্থী হলেন। ব্রাহ্মণের প্রয়োজন ছিল একটু পুরনো আতর। হাতে একটি ছোট পাথরবাটি। নবকৃষ্ণের পোষ্যপুত্র গোপীমোহনের মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। রাজকুমার তাঁকে পরামর্শ দিলেন কলসি নিয়ে চূড়ামণি দত্তের বাড়িতে যেতে। চূড়ামণি তখন স্নানে যাবেন, ব্রাহ্মণ কলসি নিয়ে গিয়ে হাজির। সব কথা ব্রাহ্মণের থেকে শুনে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না চূড়ামণি । খবর দিলেন আতরওয়ালাকে। বাবুর কথা মতো আতরওয়ালা এক কলস আতর দিয়ে গেলেন। তিন হাজার টাকা দাম মেটালেন চূড়ামণি ।

এরপর চূড়ামণির পরামর্শে ব্রাহ্মণ সব ঘটনা বলে সেই আতর দেখিয়ে এল রাজা নবকৃষ্ণকে। ব্যাপারটা শুনে ছেলেকে ডেকে বেশ রাগ উগরে দিলেন নবকৃষ্ণ। আসলে নবকৃষ্ণের প্রতিষ্ঠা সহ্য করতে পারেননি চূড়ামণি। নবকৃষ্ণ হয়ত বুঝতেন। তাই দুজনের মধ্যে এই প্রতিযোগিতাটা বেড়েই চলেছিল। কিন্তু এইসব ঘটনার সঙ্গে কালীঘাটের যোগ কোথায় ? যোগ একটাই।নবকৃষ্ণ বা চূড়ামণি দত্ত দুজনেই কালীঘাটে পুজো দিতে যেতেন ঘটা
করে। কালী বিগ্রহের কাছে মাথা নোয়াতেন দুজনেই। আর দুজনের অজান্তেই হয়ত দেবী মুচকি মুচকি হাসতেন।

যাই হোক, নবকৃষ্ণ ও চূড়ামণির এই ‘টাগ অফ ওয়ার’ যখন চরমে তখনই একদিন পরলোকের নিবাসী হলেন নবকৃষ্ণ। দুপুরে ভাতঘুম দিতে গিয়ে আর উঠলেন না। ব্যাপারটি নিয়ে কম জলঘোলা হল না। অন্তর্জলি যাত্রা বিনা একজন ‘মহান’ মানুষের মৃত্যু নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল—অর্ধেক দেহ গঙ্গাজলে না শোওয়ানো অবস্থাতেই
মৃত্যু ! প্রতিদ্বন্দ্বীকে ‘সার্থক মৃত্যু’ দেখাতে তৎপর হয়ে উঠলেন চূড়ামণি। তিনি তখন বেশ অসুস্থ। ছেলেকে ডেকে বললেন, তিনি মৃত্যুকে এবার আপন করে নিতে চান । ব্যাস, রাজা যখন চেয়েছেন, তখন কি আর আয়োজন হবে না, এমন হয় !

চূড়ামণি চললেন অন্তর্জলি যাত্রায়—‘বসানো হল তাঁকে কিংখাবের গদিতে রুপোর চতুর্দোলায়। আগে পিছে চলল ঢাক-ঢোল আর খোল-কত্তাল। দলে দলে লোক চলল লাল পতাকা নিয়ে। চতুর্দোলার মাথায় রইল নামাবলীর চন্দ্রাতপ। তুলসীমালার ঝালর। আর চারদিকে তুলসী গাছ। চূড়ো দত্ত রক্ত রঙের চেলী পরে, নামাবলী গায়ে জড়িয়ে এবং তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসলেন জপের মালা নিয়ে। ওদিকে কীর্তনের সুরে গায়করা গান ধরল:

” জগৎ জিনিয়া চূড়া-যম জিনিতে যায়।
ও নবা, তুই দেখবি যদি আয়।
ও নবা তুই দেখবে যদি আয়।
আয়রে আয়—নগরবাসী!
দেখবি যদি আয়।
যম জিনিতে যায়রে চূড়ো, যম জিনিতে যায়!
জপ-তপ কর কী, মরতে জানলে হয়।
ও নবা, তুই দেখবি যদি আয় ! “

শোভাবাজারের রাজবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চূড়ামণির লোকেরা এই গান তারস্বরে গাইতে লাগল। ‘শত্রু’-র এমন কটাক্ষ অবশ্য গিলে থাকতে হল নবকৃষ্ণের পরিবারকে।

চূড়ামণিও মারা গেলেন। তাঁর শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। আর এই অনুষ্ঠানকে পণ্ড করার জন্য হাত ধুয়ে নেমে পড়ল চূড়ামণির ‘শত্রুপক্ষ’। শোনা যায়, চূড়ামণির ছেলে কালিকাপ্রসাদ এক মুসলিম রূপবতী মহিলার সঙ্গেই অবসর কাটাতেন । সেই কেচ্ছাকে ছড়িয়ে দেওয়া হল শহরের আনাচেকানাচে। ব্যাস, বেঁকে বসলেন ব্রাহ্মণরা । চূড়ামণির শ্রাদ্ধে তাঁরা কিছুতেই অংশ নেবেন না ।

এই সময়ই উপায়ন্তর না দেখে রামদুলাল সরকারের ডাক পড়ল । এই রামদুলাল হলেন একদা দত্তবাড়ির কর্মচারী । তবে আপন বুদ্ধিবলে তিনিও কলকাতার ধনীদের মধ্যে চলে এসেছিলেন। তবে দত্তবাড়ির প্রতি কৃতজ্ঞতা তাঁর কোনদিন কমেনি। লাটুবাবু-ছাতুবাবুর বাবা রামদুলাল তাঁর একদা মণিবের বংশের এই সমস্যার কথা শুনে ছুটলেন সাবর্ণ সন্তোষ রায়ের কাছে। সাবর্ণ বংশের সন্তোষ রায় ছিলেন ধার্মিক মানুষ । মাটির কাছাকাছি তাঁর বাস। তখনকার দিনে রাজারা যখন বিলাসিতার সাগরে ডুব মেরেছে, তখন সন্তোষ রায় একেবারে সাদামাটা জীবন কাটান। তাঁর দান ধ্যান বিখ্যাত। তবে তিনি তখন বৃদ্ধ। সন্তোষ রায়কে রামদুলাল সব কথা খুলে বললেন। সন্তোষ রায় তাঁকে জানিয়ে দিলেন, দত্তবাড়ির সমস্যার সমাধান তিনি নিজে করবেন।

যথারীতি শ্রাদ্ধের দিন সন্তোষ রায় হাজার হাজার ব্রাহ্মণকে নিয়ে হাজির হলেন হাটখোলা দত্ত বাড়িতে। শত্রুপক্ষের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। ব্রাহ্মণদের আসতে দেখে শহরের তাবড় তাবড় মানুষ হাজির হলেন চূড়ামণির শ্রাদ্ধে। শ্রাদ্ধ শেষে ব্রাহ্মণ বিদায়ের জন্য সাবর্ণ সন্তোষের হাতে কালিকাপ্রসাদ তুলে দিলেন পঁচিশ হাজার টাকা। ইচ্ছাপূরণের যেন সবটাই চলে এল সন্তোষ রায়ের হাতে। সন্তোষ রায়ের অগাধ সম্পত্তি হলেও দান-ধ্যান করে তখন তিনি নাকি প্রায় ফতুর। বৃদ্ধ সন্তোষের মনের ইচ্ছা ছিল কালীঘাটের ভাঙা মন্দিরের জায়গায় একটি নতুন মন্দির নির্মাণ করবেন। কিন্তু সে অর্থ তাঁর কাছে ছিল না। তাই শ্রাদ্ধবাসরেই তিনি সকল ব্রাহ্মণের কাছে নিবেদন রাখলেন, মন্দির নির্মাণে যদি প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করা যায়। সকল ব্রাহ্মণই রাজি হয়ে গেলেন তাঁর কথায়। কালীঘাটের নতুন মন্দির তৈরি হতে শুরু হল ।

সন্তোষ রায় অবশ্য দেখে যেতে পারেননি নবনির্মিত মন্দির। বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করেন রামলাল রায়। সালটা ১৮০৯। মাথা তুলে দাঁড়ায় আজকের কালীঘাট মন্দির। ইংরেজিতে কালীঘাট টেম্পল।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

  1. আপনাদের সব প্রতিবেদনই আমি ফলো করি। মনোযোগ দিয়ে পরই। ভালোই লাগে। তবে হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে, কলকাতার বাবুদের মধ্যে শোভাবাজারের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রতিপত্তি সম্পন্ন ছিলেন বাবু রায় রাজচন্দ্র দাস। যায় সাম্রাজ্য সামলেছিলেন রানী রাসমণি।

    কিন্তু কই, আপনারা তো তাদের ইতিহাস বা গৌরব গাথা নিয়ে কিছু বলেন না? কলকাতায় তো তাদের কীর্তি দিকে দিকে আছে।

  2. অনুরোধ করবো, জানবাজারাধিপরি বাবু রায় রাজচন্দ্র দাস ও রানী রাসমণি মাতার ইতিহাস নিয়ে কিছু বলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *