পাগলাপ্পারদ

Bengal summer

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

মান্না দে-র গান শুনিয়ে বনগাঁ-শিয়ালদা লোকালে লাল-নীল-হলুদ-সবুজ ‘পেপসি’ বিক্রি করেন যে ভোলাদা, আজ সকালে গেয়ে উঠলেন, ‘পাগলা পারদ কোথায় আছে নেই কি তোমার জানা।’ লিখছি এমন। ভোলাদার গলায় গানটা শুনে লিরিক লিখলে হত ‘পাগলাপ্পারদ’। দুটো প-এর বেশি যুক্তাক্ষর লেখা গেল না ইউনিকোডে। না হলে লিখে দিতাম।

সকাল বলে আর সত্যিই কিছু নেই। সূর্য ওঠার পরেই একেবারে ভরদুপুর এফেক্ট। আর সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো বলাও এখন মহাপাপ। রাত্তিরেও গাছের পাতা নড়ে না। হাওয়া বয় না। নিশীথ যামিনী, এমন ঘামিনি। পুরনো কলকাতার এক কর্তার কথা বাদ দিলে কালবৈশাখী আর আজ বৈশাখী হয় না। শহর বলে, বাবা গুমোটেশ্বর, শান্তি দাও। মন্ত্রী ছাড়া চাইলেই কি আর দেদার যাওয়া যায় কেদারে! শুধু ধ্যান করতেই লাখ টাকা।

ট্রেনের ভেন্ডর কামরায় এক সব্জি বিক্রেতাকে বলতে শুনলাম, ‘সকালে বস্তায় শিশির মাখা বেগুন নিয়ে যাই। রাতে বেগুনপোড়া নিয়ে ফিরি। বহুত গ্যাস বেঁচে যাচ্ছে দাদা।’ বাড়ির ছাদে ডালের বড়ি শুকোতে দিতেন যে মা-কাকিমারা, তাঁরা এখন বড়ি শুকিয়ে নিচ্ছেন ঘরেতেও। ছাদের ম্যাজিক দিব্যি আসছে মেঝেতে। ঠান্ডা লেগেছে যাঁদের, গার্গল করার জন্য বাথরুমের কলের জলই যথেষ্ট। এক পরিচিত ভদ্রলোক আবার সম্প্রতি তাঁর বাড়ির একটা ঘরের জন্য দুটো কুলার কেনার প্ল্যান করেছেন। প্রথমটা ঘরকে ঠান্ডা রাখার জন্য। আর দ্বিতীয়টা ওই কুলারকে ঠান্ডা করার জন্য। পাড়ার শিবমন্দিরে কাল দুপুরে দেখলাম, শিবলিঙ্গের মাথার উপরে মাথা ঠেকিয়ে ঠায় বসে রয়েছেন পুরুতমশাই। উঠছেনই না। ভাল করে দেখাতে মালুম হল, শিবলিঙ্গের উপরে রাখা ঘটির জল টুপটুপ করে করে ঝরে পড়ছে নকুল পুরোহিতের শিরে। দমদম মেট্রো স্টেশনের সাবওয়েতে প্রতিদিন সকালে, অফিসটাইমে একটি ষাঁড় এবং দুটি গরু গা এলিয়ে শুয়ে থাকে। গোমাতার এক অন্ধ ভক্তকে দেখলাম, সদ্য কেনা মিনারেল ওয়াটারের বোতল ঢকঢক করে ঢেলে দিচ্ছেন গরুর মুখে। গরুর নাকের ঘাম হাতের তালুতে নিয়ে নিজের কপালে লাগাচ্ছেন আদরে। জিজ্ঞেস করাতে উত্তর মিলেছিল, ‘গোমূত্রে পুণ্য। গোবরে পুণ্য। গোঘামে কেন নয়?’ আজকের বাজারে গরুর তো মানুষের মতো ‘পোড়া’ কপাল নয়। তাই নাক ঘামে বেশি।

বহু ডেজিগনেশনের দেমাককে ইদানীং এক সুতোয় মিলিয়ে দিয়েছেন সূর্যদেবতা। ঠান্ডা ঘরে বসে পুতুলনাচ দেখেন যে সিইও সাহেবরা, তাঁরাও ঘামছেন। কুলির সঙ্গে জিএম-ও ঘামেন যথা, জানিও, শান্তি বিরাজে তথা। এক অ্যাডিশনাল জেনারেল ম্যানেজার সাহেবকে হালে দেখলাম, কেবিনের এসির রিমোটটা টিপতে টিপতে ‘ড্যাম ইট’ বলে মেঝেতে আছড়ে ফেললেন সজোরে। তাপমাত্রা ষোলর থেকে আর নীচে নামানো যাচ্ছিল না রিমোটে। যায়ও না। সাহেব রেগে গিয়েছিলেন। যাঁর ভুরু কুঁচকোনোয় সকাল নটা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত অফিসে মুখ বুজে, ঘাড় গুঁজে, টেনশনে ঘামতে ঘামতে কাজ করে শ দুয়েক লোক, এক সামান্য রিমোট তাঁকে হারাল হেলায়। জানলার পর্দা সরিয়ে, আকাশে উপরের দিকে তাকিয়ে কাউকে কি ‘স্যার’ বলেছিলেন সাহেব? জানে শুধু সিসিটিভি।

ডাক্তাররা বলছেন, সানগ্লাস পরুন। রাম-শ্যাম-যদু-মধু-অরুণ-বরুণ-কিরণমালা সবার চোখে এখন গান্ধারীর ফাইবার আবরণ। বেগুনী দেখা এবং চাখা গেলেও অতিবেগুনী দেখা যায় না। সানগ্লাস চোখকে বেশী বেগুনী দেখা থেকে বাঁচায়। হয়ত বাঁচায় প্রকাশ্যে দেশি বেগুনী দেখা থেকেও। ইস, অসভ্য কোথাকার। সানগ্লাসের উপকারিতা প্রচুর। প্রাকৃতিক কারণে হিরো সাজা যায়। চোখের তারায় আয়না ধরে বদনজর দেওয়া যায়। বাসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার মোবাইলের হোয়্যাটসঅ্যাপ গেলা যায় দিব্যি। এত ভাল গুণ থাকার জন্যই হয়ত একান্ত বিপাকে না পড়লে চোখ থেকে কালা চশমাটা সহজে খুলতে চাননা অনেকে। পাতালরেলের পাতাল প্রবেশের পরেও ঠিক কি কারণে চোখে রোদচশমা লাগে, এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

চিকিৎসকের কথায় বাঙালি রোদচশমা মানে, কিন্তু লেবু জল, পুদিনা জল মানে না। বরফ মানে না। রাস্তার কাটা ফল মানে না। সেই কবে, তিলোত্তমা যখন আরও একটু বেশি ঠান্ডা ছিল, কোনও এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ব্যবসার কাজে ব্যবহারের বরফের রং নাকি সাধারণ বরফের থেকে আলাদা করা হবে। রব উঠেছিল, লেবুজলওয়ালাদের কাছ থেকে বুভুক্ষুর মতো, হ্যাংলার মতো যে বরফ ভিক্ষা করি আমরা, সেগুলো নাকি আসলে মৃতদেহ সংরক্ষণ করার বরফ। রাতি পোহাইল। সমাজ সচেতন পাখিদের রবও গেল থেমে। রাস্তার মোড়ে, প্রকাশ্য রাজপথে ঠুংঠুং করতে থাকা যে লেবুজলের গাড়ির দিকে আমরা ছুটে যাই চাতকপাখির মতো, জেনেশুনে প্রতিদিন পান করি বিষ, তার কোনও লাগাম নেই। নশ্বর দেহ কাচের গাড়ি করে অন্তিম যাত্রায় চলে যায়। বরফ পড়ে থাকে। আর পড়ে থাকে পাতিলেবু, বিটনুন। বাঙালি গলা ভেজায়। ঢকঢকায়।

তপ্ত শহরে কোনও সুন্দরী রাস্তার কল থেকে চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিলে কিচিক করে আওয়াজ হয় ক্যামেরায়। পরের দিনের খবরের কাগজের জলছবি। ক্যাপশান – দারুণ দহন দিনে। যেন শুধু রূপসীরাই ঘামেন। ঘেমো শরীরে মাল্টিপ্লেক্সে ঢুকে, চীনের প্রাচীর কিংবা আইসল্যান্ডের পুকুরের ধারে যাঁদের বিলাসনেত্য দেখি আমরা, তাঁদের অনেককেই এবার ভোটের বাজারে জব্বর ঘামতে দেখেছি। হুডখোলা ভ্যানে চেপে ভরদুপুরে প্রচার করার সময় নায়িকাদের শরীরে ভিটামিন ডি হয় কি না জানি না, ঘাম হয় বড্ড। আমজনতা আম খেতে খেতে তা দেখেছে টেলিভিশনের পর্দায়। এ বাবা। দুষ্টুমিষ্টিরা কি ঘামান ঘেমেছে দ্যাকো। অথচ সত্তর বছরের উপরের যে নেতা মহোদয়দের সাদা পাঞ্জাবী সপসপে হয়ে লেগে গেল পিঠে, তাঁদের নিয়ে একটি কথাও নেই। অগ্নিদেব সবাইকেই সমান তাপ দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অবলা ঘাম দাম পায়নি।

লিখতে লিখতে কিবোর্ডের উপরে টুপ করে পড়ে গেল সোডিয়াম ক্লোরাইড মেশানো দুফোঁটা জল। পাশে খবরের কাগজ খোলা। সেটাও গরম। প্রথম পাতার ছবিগুলোতে হাত দিতেই ছ্যাঁকা লেগে গেল আঙুলে। রিমোট ঘুরিয়ে খানিক ঘুরে এলাম খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে। তাও গরম। অথচ একে অন্যকে বলে চলেছেন সমানে, বেশি গরম দেখিও না। তাঁরা শুভাকাঙ্খী বটে। শান্তি কামনাই তো করছেন আসলে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published.