লালদুর্গের পীঠস্থান আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের আলিমুদ্দিন কে ছিলেন ?

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

টানা চৌত্রিশ বছর শাসকের আসনে বসে বাংলাকে সামলেছে যে দল, সেই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সদর দফতর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। অথচ আজও প্রায় অজানা তালিকায় থেকে গিয়েছেন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের আলিমদ্দিন।চলতি কথায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিট হয়ে গেলেও যে ব্যক্তির নামে এই রাস্তা, তাঁর নাম কিন্তু আলিমুদ্দিন নয়। তিনি সৈয়দ আলিমদ্দিন আহম্মদ। বাংলার সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে তিনি বেশি পরিচিত ‘মাস্টার সাহেব’ নামেই।

১৮৮৪-র নভেম্বরে ঢাকার আশক জমাদার লেনে (ভুলক্রমে অশোক বা আকাশ পড়বেন না) জন্ম আলিমদ্দিনের। বাবা আমিরুদ্দিন আহম্মদের একটি দর্জির দোকান ছিল ইসলামপুর রোডে। আশক জমাদার রোডে প্রতিবেশী ছিল বসু পরিবার। এই বসু পরিবারের অন্যতম সদস্য হেমচন্দ্র বসু।আলিমদ্দিন এবং হেমচন্দ্র এক সঙ্গেই বড় হয়ে ওঠেন । ঢাকার বেচারাম দেউড়ি রোডে আব্দুল গণি সাহেবের ফ্রি স্কুলের দুজনেই ছাত্র। দুজনেই তৃতীয় শ্রেণি (এখনকার ক্লাস এইট) পর্যন্ত এক সঙ্গে পড়েন। এরপর আলিমদ্দিন পড়াশোনা করতে শুরু করেন স্থানীয় মাদ্রাসায় আর হেমচন্দ্র কে এল জুবিলি স্কুলে। ১৯০৬ সালে এন্ট্রান্স পাশ করে আলিমদ্দিন ভর্তি হন ঢাকা কলেজে।

বছর চারেকের মধ্যে অবশ্য আহম্মদ পরিবারে নেমে আসে ঘোর বিপর্যয়। আমিরুদ্দিনের মৃত্যু হয়। আশক জমাদার লেনের বাস ওঠাতে হয় আলিমদ্দিনদের। তাঁদের চলে আসতে হয় উর্দু অঞ্চলে খোয়াজ দেওয়ান রোডে। পারিবারিক অসচ্ছলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে আলিমদ্দিনের আর এফ.এ পরীক্ষা দেওয়া হল না। ঢাকা কালেক্টরেটে চাকরি নিতে হল। আর অবসর সময় ছাত্র পড়িয়ে উপার্জন করে সংসারকে সচ্ছলতার দিকে নিয়ে যেতে থাকলেন তিনি। যেহেতু বাড়িতে ছাত্র পড়াতেন, সেহেতু তিনি পরিচিত হলেন মাস্টারসাহেব নামেই।

তবে মাস্টারসাহেব কিন্তু তখন সশস্ত্র আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। ১৯০২ সালে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন তিনি। বন্ধু হেমচন্দ্রের সঙ্গে হাতে হাত দিয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন। বন্ধুর মনে দেশকে স্বাধীন করার মন্ত্রটা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন হেমচন্দ্রই। আর হেমচন্দ্রের মনের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এ প্রসঙ্গে রন্তিদেব সেনগুপ্ত লিখছেন—‘১৯৭৮ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রহ্মচারী শঙ্কর হেমচন্দ্র ঘোষের একটি সাক্ষাৎকার নেন। হেমচন্দ্র ওই সাক্ষাৎকারে বলেন বিবেকানন্দের মৃত্যুর একবছর পূর্বে ১৯০১ সালে তিনি বিবেকানন্দের সংস্পর্শে আসেন। তখন বিবেকানন্দ তাঁকে বলেছিলেন, আমাদের প্রথম দরকার স্বাধীনতা—Political Freedom, তাই সর্বপ্রথম ইংরাজকে এদেশ থেকে তাড়াতে হবে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। বুলি কপচিয়ে নয়, গায়ের জোরে সংঘদ্ধ সংগঠিত আক্রমণের সাহায্যে…’

১৯০৫-এ হেমচন্দ্র যখন তাঁর গুপ্তসমিতি, মুক্তিসঙ্ঘ তৈরি করেন, তখন তাঁর প্রতিষ্ঠাতা সভ্য ছিলেন মাস্টারসাহেব। আলিমদ্দিন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করেন হেমচন্দ্রের থেকে এবং বৈপ্লবিক অ্যাকশন করার পাঠ নেন শ্রীশচন্দ্র পালের থেকে। শরীরচর্চায় সুদক্ষ ছিলেন বলেই আলিমদ্দিন একটি আখড়াও তৈরি করেন।আখড়া আসলে হেমচন্দ্র ঘোষের দলের একটি রিক্রুটিং সেন্টার। এই আখড়ায় অনেক হিন্দু-মুসলিম ছেলে শরীরচর্চায় আসত, আর তাঁদের বিপ্লবী দলে রিক্রুট করার দায়িত্ব সুকৌশলে পালন করতেন আলিমদ্দিন।
মাস্টারসাহেব ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। দিনে পাঁচবার নমাজ পড়তেন। তাই পুলিশের কোনও সন্দেহ ছিল না তাঁর ওপর। বিপ্লবীরাও এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তাঁর কাজ ছিল অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, শেল্টারের ব্যবস্থা করা এবং নথিপত্র সামলানো।

তবে আন্দোলনে সব সময়ই প্রয়োজন অর্থ। বিপ্লবী দলে অর্থসঙ্কট এক সময় প্রবল হয়ে দেখা দিল। রসদ জোগানোর জন্য পুলিনবিহারী দাসদের অনুসরণ করে শ্রীশচন্দ্র পাল এবং মাস্টার সাহেব গঠন করলেন ‘স্বদেশী ডাকাত দল’। দেশদ্রোহী, অত্যাচারী জমিদার, জোতদার, মহাজনদের ধন সম্পদ লুঠ করত এই ডাকাত দল। ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত-রায় তাঁর ‘ভারতের সশস্ত্র বিপ্লব’ বিপ্লব গ্রন্থে এমনই এক ডাকাতির রাতের বর্ণণা দিয়েছেন। ১৯১০ সালের সেই রাতের ডাকাতিতে নেতা শ্রীশচন্দ্র এবং উপ-নেতা মাস্টারসাহেব।

এক গৃহস্থের বাড়িতে ডাকাতি করার সময় এক তরুণী কিন্তু তাঁর গায়ের অলঙ্কার দিতে চাইলেন না। তাঁর কোলের সন্তানকে কেড়ে নেওয়ার পরও তিনি গায়ের গয়না খুললেন না। শেষ পর্যন্ত ডাকাত দল বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এই সময় তরুণী বলে উঠলেন—‘আমি আমার মার কাছে এসেছি। বড়ই গরীব আমার বিধবা মা। রাতে তাঁর কুঁড়েঘরে আমাকে থাকতে না দিয়ে তিনি এখানে শক্ত আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন। আমি বুঝেছি অর্থ ও গহনা আপনাদের কত প্রয়োজন। আমার স্বামী বিরাট ধনী। আমার স্বামীর ঘরে গেলে আমিই আপনাদের হাতে সর্বস্ব তুলে দিতাম। আমি জানি, আপনাদের অর্থ দেওয়া সার্থক। কিন্তু এখানে কিছুই দিতে পারব না। কারণ, আমার শ্বশুরঘরের কেউ যে বিশ্বাস করবেন না আলঙ্কার-লুন্ঠনের গল্প ! তাঁরা ভাববেন যে, আমার মারই গহনা আত্মসাৎ করবার এ
এক কারসাজি। আমি জীবন থাকতে আমার মাকে মিথ্যা কলঙ্কের বোঝা বহন করতে দেব না।…’

নিজে ধর্মপ্রাণ, তবে কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে মাথা চাড়া উঠতে দেননি আলিমদ্দিন। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের সময়ও তাঁর পাড়ায় কোনও দুষ্কৃতী মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। নিজে হাতে প্রতিরোধ করেছিলেন দাঙ্গা। শুধু কি তাই, তাঁদের আমলে ঢাকা শহরে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে বেশ কিছু সমাজবিরোধী।সেই সমস্ত সমাজবিরোধী গুন্ডাদের দমন করেছিলেন মাস্টারসাহেব। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু হেমচন্দ্র। ১৯১৫-র পর বিপ্লবী নেতাদের অনেকেরই কারাবাস হল। কিন্তু সংগঠনকে বাঁচিয়ে রাখলেন মাস্টারসাহেবের মত দু-তিনজন নেতারা। জেল থেকে মুক্তির পর বিপ্লবীদের তাই ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধা হল না। তবে সবটাই হতে লাগল ছদ্মবেশে। কেউ সংসারী হলেন, কেউ আবার ধর্মজীবনের ভেক ধরলেন । ‘মাস্টারসাহেব এমনিতেই ধর্মচর্চায় বিশ্বাসী। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল নিজেকে ঐ ধর্ম অনুশীলনের আবরণে গুটিয়ে ফেলার জন্যে। কারণ, অন্তত আগামী আট-দশবছর ধরে নূতনতর দল গড়ে ইফেকটিভ এক বৈপ্লবিক-পরিকল্পনা নিয়ে ভবিষ্যতে একদিন ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি করতে হবে। কাজেই, তাঁদের মত দল-নেতাদের সংগোপনে বাস করে সবার অলক্ষ্যে উক্ত দল-গঠনে ব্রতী হওয়ার দরকার।…মাস্টারসাহেব সাগ্রহে কোরাণ-গীতা-বাইবেল নিয়ে মশগুল হলেন। কিন্তু কুস্তির আখড়াটি ঠিকই চলল। গোপনে দল-সংগঠনেও তিনি বিরাম দিলেন না।…পাড়ার লোক তাঁকে আরো বেশি করে জানতে থাকল কুস্তিবিলাসী, সত্যনিষ্ঠ, শিক্ষিত, সর্বধর্ম সমন্বয় -সাধক এবং অকৃতদার…’

মাস্টারসাহেব অবশ্য বেশিদিন বাঁচেননি। অলিমদ্দিনকে ছিনিয়ে নিল যক্ষ্মা। সালটা ১৯২০। মাস্টারসাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর মুসলিম শিষ্যরা চলে গেলেন অন্তরালে। ‘সবার অলক্ষ্যে’ গ্রন্থে লেখা হচ্ছে—‘১৯২০ সালের পর থেকে খগেন দাস, সুরেন বর্ধন (ডাঃ), কৃষ্ণ অধিকারী ও মাস্টারসাহেব (আলিমদ্দিন আহম্মদ) অতি সংগোপনে ও ধীরে ধীরে সেল সিষ্টেমে সংগঠন কার্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন প্রধানত মফঃস্বলে ও শহর-প্রান্তে। মাস্টারসাহেব বেশি দিন কাজ করতে পারেননি। দারুণ যক্ষ্মা রোগে অকালে তাঁর মৃত্যু হয় । তাঁর মাধ্যমে অতি স্বাভাবিকতায় সেকালে মুসলমান কর্মিগণ দলীয় সভ্যসংখ্যা বৃদ্ধি করেছিলেন। তাঁরা কিন্তু তখন জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে দল গড়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক এক স্বাধীন ভারত-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন এই দলের কর্মীদের চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু এ বস্তু দেখেছিলেন তাঁরা মাস্টারসাহেবের চোখ দিয়ে। তাই মাস্টারসাহেবের মৃত্যুতে তাঁদের স্বপ্ন দেখার চোখ এবং আদর্শ বুঝবার মন অন্তর্হিত হয়ে গেল। বিপ্লবের পথ থেকে তাঁরা হারিয়ে গেলেন!’

বিপ্লব অবশ্য হারায়নি। দেশ স্বাধীন হয়েছে। এগিয়ে চলেছে। আরও নাগরিক হয়েছে সভ্যতা। আর যাঁদের জন্য এই স্বাধীনতা, এগিয়ে চলা, সেই সমস্ত বীর সেনানীরা আজও বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ে। আলিমদ্দিনও বেঁচে আছেন একই ভাবে। আজও।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

  1. জনাব আলিমুদ্দিন সম্পর্কে আরো বিস্তারিত কী জানানো সম্ভব ? কিম্বা তাঁকে নিয়ে লেখা কোন বই’র নাম জানানো সম্ভব ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *