সাঁইবাড়ির কলঙ্কে হাত রক্তাক্ত হলেও এই লাল দুর্গের বিশ্বস্ত সৈনিকের উপমা সত্যি বিরল

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

বাম জমানায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ স্লোগানকে কার্যকর করার অন্যতম ট্রাস্টেড সোলজার ছিলেন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন । শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের শিল্পায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন । তাঁর সময়েই পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে শিল্প বিনিয়োগ টেনে আনায় সামনের সারিতে উঠে আসে । কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইস্পাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আনতেও তিনি সাফল্য দেখিয়েছিলেন । পাশাপাশি বিতর্ক কোনওদিনই তাঁর পিছু ছাড়েনি । সাঁইবাড়ির কালো ছায়া সারা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে ।

যদিও বামেদের দাবি, মিথ্যা মামলায় তাঁকে ফাঁসিয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেস সরকার । তবে সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ডের কথা উঠলেই শিউড়ে উঠতে হয় । ছেলেদের হত্যার পর তাঁদের রক্ত মাখানো ভাত খেতে মাকে বাধ্য করা হয় । সাঁইবাড়ি তাই শিল্প সংস্কারের গৌরবের মধ্যেই কোথাও চোরাগোপ্তা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।

২০০৮ সালে মে মাসে উন্নয়ন নিয়ে এক আলোচনা সভার প্রধান অতিথি নিরুপম সেনকে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে নিয়ে আসার ভার পড়েছিল আমার ওপরে । কথায় কথায় প্রথমে সিঙ্গুর পরে নন্দীগ্রাম- শিল্পের নামে জমি অধিগ্রহণ নীতি নিয়ে সরকারের উপর যে চাপ বাড়ছে; প্রসঙ্গ তোলামাত্র নিরুপম সেন স্পষ্ট জানান, রাজ্যের বেহাল শিল্পের বদল আনতে গেলে বিনিয়োগকারীর পছন্দের জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে । কথাগুলি আগে ও পরে বণিকসভার সম্মেলন থেকে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তাঁকে অনেকবার বলতে শুনেছি ।

রাজ্যের আর্থিক বেহাল দশা ফেরাতে যে একটা “হোলিস্টিক ডেভলপমেন্ট মডেল ” দরকার তার জন্য সেদিনও সওয়াল করলেন । যুক্তি পাল্টা যুক্তি-সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম-কে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি-তে একইরকমভাবে যুক্তি সাজালেন । যে কথাগুলি তার মুখে তখন সবাই শুনত, প্রশ্নও উঠত কিন্তু নিরুপম সেন মেজাজ হারিয়েছেন এমনটা মনে হয় ঘটেনি ।

ফেরার সময় ” বন্টন ব্যবস্থার রাজনীতি”; বা ” রিডিস্ট্রিবিউটিভ ওয়েলফেয়ার ইনিসিয়েটিভ “-এর চিন্তা ভাবনা থেকে সরে এসে কেন ” প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ” সেসব নিয়ে বলেছিলেন। আমি বলেই ফেলি; একটা সময়ে গিয়ে এটা শিল্পের জন্য কৃষির বিরোধিতা হয়ে দাঁড়াবে না তো ? প্রবীণ নিরুপম কিন্তু হেসেছিলেন । তারপর বলতে থাকেন, ” ছোট শিল্পের জন্য অল্প জমি সরাসরি জমি মালিকের কাছ থেকে কিনে নেওয়া সম্ভব । বেসরকারি সংস্থাকে আমরা সেই কাজেই উৎসাহিত করি । কিন্তু বড় শিল্পের জন্য অনেকটা জমির প্রয়োজন হলে বেসরকারী সংস্থা জমি সংগ্রহের জন্য জমি ব্যবসায়ীদের নিয়োগ করে, তারা সস্তায় জমি কিনে বেশি দামে হস্তান্তর করে থাকে । এই কারণেই কৃষক বা জমি মালিকের স্বার্থ সুনিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার হস্তক্ষেপ করে থাকে । রেল সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ার যে শর্তের উল্লেখ করেছে সেটা সংবিধান অনুসারে সম্ভব নয় । আইনে অনিচ্ছুক বলে কাউকে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই । পশ্চিমবঙ্গ শিল্পে পিছিয়ে বলে যে অভিযোগ তা কেন্দ্রীয় সরকারের লাইসেন্স নীতি এবং মাসুল সমীকরণ নীতির জন্য পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলি স্বাধীনতার পর থেকেই শিল্পে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে । ছয়ের দশকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কৃষিসঙ্কট । বামফ্রন্ট সরকার ভূমিসংস্কার করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য সমস্যার অনেকটা সমাধান করেছে । আর নয়ের দশকে কেন্দ্রীয় সরকার লাইসেন্সিং পদ্ধতি ও মাসুল সমীকরণ পদ্ধতি তুলে নেওয়ার পর থেকে বামফ্রন্ট সরকার শিল্পেও বেসরকারি বিনিয়োগ আনতে শুরু করেছে । ”

বারবার উন্নয়নের স্বার্থে ভারী শিল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন নিরুপম সেন । কিন্তু সিঙ্গুরের পিঠোপিঠি নন্দীগ্রামেও অসন্তোষ বেড়েছিল। তাঁর ভাবনাই ছিল কৃষিকে ভিত্তি বানিয়ে শিল্পোন্নয়ন । সন্দেহ নেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জন্য রাজ্যের বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিলেন । নিরুপম সেন নিজেও সেটা জেনে গিয়েছেন ।

ফের একবার বলি; বিতর্ক নিরুপম সেনের পিছু ছাড়েনি । বাম জমানা অবলুপ্তির পর স্টেট ব্যাঙ্কের একটি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট-এ দেখা যায় নিরুপম সেন ও বিমান বসুর নামে ২০১৩-র ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত জমার পরিমাণ প্রায় ১৬ কোটি টাকা । ঠিকানা: ৩১, আলিমুদ্দিন স্ট্রিট । অর্থাৎ, সিপিএমের রাজ্য দফতর । দুই পলিটব্যুরো সদস্যের নামে এত বিপুল টাকার একটি অ্যাকাউন্ট কী ভাবে কাজ করেছে ? ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের যাবতীয় নিয়মকানুন মানা হয়েছে কি ? হিসেবনিকেশ কি দেখানো হয়েছে ব্যক্তিগত আয়করের রিটার্নে ? তড়িঘড়ি প্রস্তাব পাশ করিয়ে সিপিএমের লেটারহেডে চিঠি দিয়ে বিমানবাবু ও নিরুপমবাবুর নামের ওই অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সরাসরি দলের রাজ্য কমিটির নামে । কিন্তু প্রশ্ন কি তাতে কমেছে ?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

6 Responses

  1. যথেষ্ট ভাল লেখা, অল্প কথায় অনেকটাই বলেছেন।

  2. নিরুপম সেন সম্পর্কে লেখকের মতামতে একমত হয়েও জানাচ্ছি ব্যাঙ্ক অয়াকাউন্ট ঘটনাটি একেবারেই ঠিক ঘটনা নয়, ওটা একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।

  3. লেখক নিরুপম সেনকে কতখানি চিনতেন জানি না, তবে সাইবাড়ি ঘটনা এবং ব্যাঙ্কের অয়াকাউন্ট ঘটনার কোনও প্রভাব তাঁর গুরুতবপূর্ণ ভূমিকায় কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি।

  4. প্রয়েত নিরুপম সেনের ওপর যতগুলি লেখা পড়লাম বলতে দ্বিধা নেই যে এটি সেরা ।

  5. মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে একটু বেশী চর্চা হবে জানাই ছিল তবে লেখাটি সমালোচনা হলেও যুক্তিযুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *