বাঘের দুধ

Bagher Dudh

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

ডানদিকে কোথায় চললি রে শান্টু? লাতেহারের পথ কি এদিকে নাকি?
এদিকেই তো। গাড়ি চালাতে চালাতে মুখ না ঘুরিয়েই বলল শান্টু।

পাশে-বসা নির্মলবাবু স্বগতোক্তি করলেন, সব কিছু এতো অন্যরকম হয়ে গেছে তোদের ডালটনগঞ্জ শহরে এই পঁচিশ বছরে যে, কিছুই আর চিনি বলে মনে হয় না।

শান্টু উত্তর না-দিয়ে গিয়ার বদলে গাড়িকে সেকেন্ড গিয়ার এদিয়ে লেভেল ক্রশিংটা পেরিয়ে গেল।

হ্যাঁরে। বাঁদিকের এই বাড়িগুলো কবে হল রে? এগুলোও কি বিডিপাতার ব্যবসাদার গুজরাতিদের?

শান্টু উত্তর দিল না কোনও।

অনেকই চেষ্টা করেছিল গুরুজন মেসোকে অন্য গাড়িতে চালান করার। কিন্তু মেসো শান্টুকে বিশেষই ভালোবাসেন। তাই ওই গাড়িতেই জবরদস্তি করে উঠলেন তিনি। এদিকে অনেকক্ষণ সিগারেট না-খেয়ে এবং আরও অনেকক্ষণ খেতে পাবে নাযে, এ কথা মনে করেই ওর মেজাজ বিগড়ে ছিল। যত্ত সব বুড়ো-পার্টি। মোহনদার বৌভাতের পর নতুন বউকে নিয়ে চার গাড়ি ভর্তি করে ওরা চলেছিল মোহন বিশ্বাসের
ছিপাদোহরের ডেরাতে। মুনলাইট পিকনিক হবে সেখানে।

হু-হু করে হাওয়া ঢুকছিল গাড়িতে। ফ্বুয়ারির মাঝামাঝি। মিষ্টি মিষ্টি ঠাণ্ডা। এখনও রোদ আছে নরম মোমের মতো। বিকেলে বড় আরাম লাগে এই শীত-শেষের অবসরের রোদে।

মুখ হাঁ করে অক্সিজেন নিচ্ছিলেন নির্মলবাবু ফুসফুসের আনাচ কানাচ ভরে। কলকাতায় মুখ হাঁ করলেই তো ডিজেলের ধোঁয়া নয়তো সি এম ডি -জ কালি! স্বাস্থ্য যতটুকু ভালো করে নেওয়া যায়।

এক সময় এই ভালটনগঞ্জেই অনেকদিন ছিলেন নির্মলবাবু। শহরে এবং আশেপাশের জঙ্গলে। তখন বড়-সন্বন্ধী বেচে। এক ডাকে চিনতো তাকে লোকে, মোহন বিশ্বাসের ববা মুকুন্দ বিশ্বাসকে । কোনও বাঙালিই এখানে এসে তার অতিথি না হয়ে যেতে পারতেন না কোনওত্রমেই।

ধুতির উপর সাদা টুইলের ফুলহাতা শার্ট । কলার তোলা থাকতো। আর বুকের বোতাম সব সময় খোলা। বুক পকেটে একটা রুমাল বলের মতো গোল করে পাকানো থাকতো। এখানের কুয়োর জলে আয়রন থাকাতে দাতগুলো সব কালো হয়ে গেছিল বড়দার। তার উপর অবিরাম পান আর সিগারেট তো ছিলই।

আহাঃ! কী সব দিনই গেছে তখন।

লাতেহারের পথ ছেড়ে গাড়ি ডানদিকে ঢুকল। নিম লবাবু বললেন, এ কিরে শান্টু? এ যে পাকা রাস্তা দেখছি! পাকা হলো কবে?

শান্টু বিরক্তির গলায় বলল, আমি তো এখানে এসে অবধিই দেখছি।

তুই কতদিন আছিস এখানে?

তা কম দিন নয়, পনেরো বছর হবে।

ফুঃ। পনেরো বছর। আমি বলছি চল্লিশ বছর আগের কথা। কত অন্যরকম ছিল সব কিছু।

হবে। শান্টু সংক্ষিপ্তভাবে বলল।

কুট্কু-তে নাকি ড্যাম হচ্ছে শুনি?

হু। শান্টু বলল।

বেতলাতে নাকি বিরাট টুরিস্ট লজ হয়েছে?

হু। শান্টু আবার বলল।

শান্টু তাকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিল না দেখেও নির্ম লবাবু দুঃখিত হলেন ন। বড় ভালোমানুষ, অপনভোলা লোক তিনি। ডালটনগঞ্জ ছেড়ে ছোট শালার কোম্পানির কাজে ওড়িশার সন্বলপুর, ঝাড়সুগুদা, বামরা এসব জায়গায় কেটেছিল মাঝের ক’টি বছর। তারপর কলকাতার উপকণ্ঠে ছোট একটি বাড়ি করে থিতু হোচ্ছেন উনি। দীর্ঘ দিন পরে মোহনের বিয়ে উপলক্ষে ডালটনগঞ্জে এসে পড়ে কত সব পুরোনো ঘটনা, পুরোনো কথা, ভুলে-যাওয়া কলির মতো, ফেরারি-পাখিদের মত দ্রুত ফিরে আসছে আবার স্মৃতির দাঁড়ে। খুবই ভালো লাগছিল নির্ম লবাবুর। আবার ভারী খারাপও লাগছিল।

কেন যে ভালো-লাগা আর কেন যে খারাপ-লাগা ; তা উনিই জানেন। নিজে একাই শুধু বুঝতে পারছেন। সেই মিশ্র অনুভূতিতে ভরপুর হয়ে আছেন তিনি। কিন্তু সেই অনুভূতির ভাগ আর কাউকেই দিতে পারছেন না। তার সমসাময়িক কেউ আর নেই এখন।

দিতে চাইলেও নেওয়ার লোক নেই কেউ।

এবারে তিনি পিছনের সিটে বসা মেয়েদের দিকে ফিরে বল্লেন, তোমরা বললে বিশ্বাসই করবে না হয়তো, এই বেতলাতেই আসতাম, হয় মিলিটারি জিপ, নয়তো পেট্রোলে চলা ছোট ফোর্ড ট্রাকে চড়ে। কাচা রাস্তা ছিল পুরোটাই লাল ধলোতে ধুলোময়।

দু-পাশে গভীর জঙ্গল ছিল। শাল, সেগুন, পিয়াশাল, আসন, গামহার, পন্নন আর বাঁশ। বাঁশের কঞ্চি এসে লাগত ট্রাকের দু-দিকের ডালায়। আর কী হাতি আর বাইসনই না ছিল! আর বাঘের কথা? চিতাবাঘ তো ছিল মুড়ি-মুড়কির মতো। বড় বাঘই কী কম! তখন কাগজ কোম্পানির বব রাইট আর অয়ান রাইট শিকারে আসতেন বছরে তিনবার করে। কলকাতা থেকে গুহ সাহেবরা আসতেন।

তারপর একটু চুপ করে থেকে মেয়েদের মন্তব্যের অপেক্ষা করে, সকলকেই নীরব দেখে, আবার বললেন, আচ্ছা তোমরা কেউ বাঘের দুধ দেখেছো?

বাঘের দুধ? মেয়েরা সমস্বরে হেসে উঠল।

শান্টু বলল, এতক্ষণে একখানা ছাড়লেন মেসো।

আরে? সত্যি বলছি। নির্ম লবাবু উত্তেজিত হয়ে বললেন। শোনো তাহলে বলি।

গোপা বলল, মেসোমশাই, ছিপাদোহরে গিয়েই না হয় বলবেন বাঘের দুধের গল্পটা । সকলে মিলে না-শুনলে মজাই হবে না। নতুন বউও শুনবে তো। এমন একটা গুল-গল্প।

নির্মলবাবু বললেন, আচ্ছা। শুনে তখন, গুন না ঘুটে। গাড়িটা উরঙ্গার বিজ পেরিয়ে, মোড়োয়াই বারোয়াডি কুটকুর পথ ডাইনে ফেলে বাঁয়ে বেতলার দিকে চলল।

এই ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে আর বেশি কথা বলবেন না ঠিক করে নির্মলবাবু বাঁয়ে চেয়ে একমনে জঙ্গল দেখতে লাগলেন। শীত শেষের জঙ্গলের হরজাই গন্ধ নাকে নিয়ে বড় খুশি হলেন অনেকদিন পর।

বেতলার চেকনাকাতে সবগুলো গাড়ি দাঁড়াল। নির্মলবাবু হঠাৎই চেচিয়ে উঠলেন। আরে আরে অয়াই তো সেই জায়গাটা! এই যে, যেখানে পালামৌ ফোর্টে যাবার পথ বেরিয়ে গেছে বায়ে এই রাস্তা থেকে, ঠিক ওই মোড়েই একটা মস্ত শিমূল গাছ ছিল না? ম–স্ত গাছ, বুঝলি। একদিন ঠিক এই সময়ে, সন্ধের মুখে দেখি বিরাট একটা দীতাল হাতি আমাদের পথ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মহা মুশকিল। কী করি ভাবছি এমন…

— মেসো পান খাবেন? রতন সামনের গাড়ির ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসে জিগগেস করল।

খাওয়া একটা। মেসো বললেন। তারপর বললেন, জর্দা নেই কারও কাছে?
— নাঃ।

দুস্স।

নির্মলবাবু বললেন।

জর্দা ছাড়া পানে মজাই নেই।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *